সাকা হাফং (Saka Haphong), ত্রিপুরা ভাষায় যার অর্থ পূবের পাহাড়। বম জনগোষ্ঠীর মানুষরা একে ডাকে ত্লাং ময়, বাংলায় সুন্দর পাহাড়। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের নাম তাজিংডং, তা জেনেই আমরা বড় হয়েছি। প্রথম সত্যটি জানতে পারি ২০১৫ সাল নাগাদ। তখন সবে পাহাড় ঝিরিপথের প্রেমে পড়েছি। অনলাইনে ঘাটাঘাটি করে জানতে পারি সবচেয়ে বড় পাহাড়ের নাম সাকা হাফং(Saka Haphong), তাজিংডং ও না, কেওক্রাডং ও না। তখনই এই পাহাড়কে দেখার এক অদম্য ইচ্ছে চেপে বসে। কিন্তু কিছুদিনের মাঝেই বুঝে ফেলেছিলাম এখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না, আর অনুমতি ছাড়া পাহাড়ে যাওয়ার মত যোগ্য এখনো হয়ে উঠিনি। তাই সাকা হাফং(Saka Haphong) জয়ের ইচ্ছে মনের অতলেই ডুবে রইলো।
৪ বছর পর এখন ২০১৯ এর অক্টোবর চলছে এখন। দেড় মাস আগেই বান্দরবান থেকে এসেছি আমরা সবাই, আপাতত যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল না কারো। ঘটনা ঘটলো যোশী ভাইয়ার কলের পর। যোশী ভাই তাগাদা দিল চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি। কোথায় যাব কোথায় যাব খুঁজতে খুঁজতে বলে বসলাম চল সাকা হাফং(Saka Haphong) যাই, ভাইয়াও বললো চল যাই। দলের বাকী সবাই কে জানানো হল, সবাই খুবই উত্তেজিত। উচ্চতা যাই হোক, নিজের দেশের সববেয়ে উঁচু চূড়া, কিছুটা উত্তেজনা কাজ করা স্বাভাবিক। সাকার(Saka Haphong) প্ল্যান আমার আর মেহেদীর আগেই আগানো ছিল, টিম মিটিংয়ে যোশী ভাইয়া আরো কিছু তথ্য দিলেন এবং সংশপ্তক অভিযাত্রীর তুহিন ভাইয়া ফোনে অনেক পরামর্শ দিলেন। আমাদের কাছে বিডি এক্সপ্লোরারের ফাহিম ভাইয়ার ২০১৪ সালের রেকর্ডেড ট্রেইল যেটা নেফিউ পাড়া হয়ে যায় ও সংশপ্তক অভিযাত্রীর ২০১৭ সালের জিপিএস ট্রেইল যা সাজাই পাড়া হয়ে যায়, এই ট্রেইল দুইটি জোগাড় করি। আমরা সবার তথ্য, আমাদের ম্যাপে করা প্ল্যান মিলিয়ে অভিযানের একটি নতুন রুপরেখা দাড় করি। আমরা প্ল্যান করি থানচি থেকে সরাসরি পূর্বদিকে এগিয়ে যাব। রেমাক্রী খাল পার হয়ে, সরাসরি নেফিউ ঝিড়ি ধরে নেফিউ পাড়া ও বিজিবি ক্যাম্প ছাড়িয়ে আরো সামনে এগিয়ে তারপর জংগল ঠেলে সাকার মেইন ট্রেইলে উঠে পড়ব। একে একে প্ল্যান ফাইনাল করা, ব্যাকআপ প্ল্যান তৈরী করা, টিকেট কাটা, টিম গুছানো, বাজার করা ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক কাজগুলো গুছানো হয়ে গেল। অবশেষে ১৬ই অক্টোবর রাত ১১টার বাসে চড়ে আমরা ৫ জন যথাক্রমে সাঈদ মেহেদী হাসান, গোলাম তাওহীদ যোশী(অতিথি সদস্য), সিফাত আমিন আদিল, তুহিন হোসেন ও পেয়ার আলম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।
ঘড়িতে তখন ৫টা বাজে যখন বাস আমাদের বান্দরবানের শহরে নামিয়ে দিল। হোটেলে নাস্তা করার পাশাপাশি সবাই ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি। শঙ্খের পাড়ে কিছু মানুষ পূজো দিচ্ছে, দূরের পাহাড় চূড়োতে সোনালি রোদের আঁচড় পড়েছে। নাস্তা খেয়ে থানচির প্রথম বাসে উঠে পড়লাম। বাসের জানালায় শরৎের পাহাড় দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম। আরো ৫ ঘণ্টার ক্লান্তিকর বাস জার্নি করে থানচি নামলাম দুপুর ১টায়। দুপুরের খাবার শেষ করে তুতং পাড়ার ট্রেইলে হাটা শুরু করলাম। তুতং পাড়াকে ডান পাশে রেখে বোর্ডিং পাড়ার ট্রেইলে উঠলাম। ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা বোর্ডিং পাড়ায় এসে পৌছালাম। ম্রো মানুষেরা বাস করে এখানে, কারবারি দাদার বাসায় রাতে থাকার ব্যবস্থা হল। খাওয়ার পাট চুকিয়ে বাইরে এলাম তারা দেখতে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হলে ঘরে ফিরে এলাম। দাদাদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে পাড়া থেকে বেরিয়েই বিশাল এক চড়াই ধরে উঠছি। জুমের মাঝ দিয়ে চলা ট্রেইলটি গিয়ে মিশলো শেরকর পাড়ার ট্রেইলে। দুপুরের কড়া রোদে না হেটে শেরকর পাড়ার লালসিয়াম দাদার ঘরে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। সুযোগ পেয়ে গোসল করে নিলাম সবাই। বিকেলের শুরুতে ট্রেইলে নেমে গেলাম আবার। দোতং পাড়ার ট্রেইলে উঠলাম আমরা। রাস্তার দুপাশে নতুন জুম, ১৮০° ভিউতে দেখা যাচ্ছে চিম্বুক ও মদক রেঞ্জ। জুমঘর দেখেই দৌড়ে উঠলাম। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম আজ এখানেই রাত্রিযাপন করবো।

তারপর সব সুন্দর এই পাহাড়ে এসে মাথা নত করে
শরৎের পাহাড় যে কত সুন্দর হয় তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। মেঘ, পাহাড় আর সূর্য মিলে এক মায়াময় আবহ তৈরী করেছে। রান্না শেষ করে ঘরের মাচায় এলাম। পূর্ব আকাশে চাঁদ উঠেছে, চাঁদের আলোয় দেখছি মেঘেদের দল আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমরা অপেক্ষায় আছি। ব্যস্ত শহুরে জীবনেও আমরা অপেক্ষায় থাকি। কখনো বাসের অপেক্ষা, অফিস ছুটি হওয়ার অপেক্ষা, মাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা। অথচ আজ রাতে অপেক্ষায় আছি মেঘের। জীবন বড় সরল ও সুন্দর এই পাহাড়ে।
শীতের তাড়নায় ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। ব্যাগ গুছিয়ে আবারো ট্রেইলে নামলাম আমরা। নিচের উপত্যকা গুলো মেঘে ঢেকে আছে এখনো। দোতং পাহাড়ের পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সূয্যিমামা। একটি উতরাই নেমে এসে পড়লাম দোতং পাড়ায়। ত্রিপুরা পাড়া এটি, পাড়ায় লোকজন তেমন নেই। সবাই জুমের ফসল কাটায় ব্যস্ত। কারবারির ঘরে গিয়ে রান্না করলাম আমরা।
শীতের তাড়নায় ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। ব্যাগ গুছিয়ে আবারো ট্রেইলে নামলাম আমরা। নিচের উপত্যকা গুলো মেঘে ঢেকে আছে এখনো। দোতং পাহাড়ের পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সূয্যিমামা। একটি উতরাই নেমে এসে পড়লাম দোতং পাড়ায়। ত্রিপুরা পাড়া এটি, পাড়ায় লোকজন তেমন নেই। সবাই জুমের ফসল কাটায় ব্যস্ত। কারবারির ঘরে গিয়ে রান্না করলাম আমরা।

দোতং পাহাড় ও দোতং পাড়া
মেহেদী আর যোশী ভাইয়া গেল দোতং পাহাড়ে উঠতে। ঘরের বয়স্ক দিদির সাথে জমে গেল আমার। দিদি একবার ঢাকায় গিয়েছিলেন, ঢাকা যে কত সুন্দর তার বর্ণনাই দিচ্ছিল দিদি মূলত। খেয়েদেয়ে একটু গড়িয়ে নিলাম আমরা বাকী তিনজন। যোশী ভাইয়া আর মেহেদী যখন ফিরলো তখন ভর দুপুর। তারা একটু বিশ্রাম নিয়ে নিল, একটু পরে আমরাও বের হয়ে গেলাম। এবারের গন্তব্য বুলুং পাড়া। প্রথমে ঝিড়ি, তারপর এক খাড়া চড়াই। চড়াই শেষ হতেই একটি বাঁক ঘুরার পর চোখের সামনে চলে কাঙ্খিত পাহাড়, সাকা হাফং। উচ্চতা মোটে ৩৫০০ ফিট, তবে নিজের দেশের সবচেয়ে বড় পাহাড় হওয়াতে খুব আবেগ কাজ করছিল মনে। আদিল খুব তাড়া দিচ্ছিল সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায়, পূর্বদিক থেকে কালো মেঘের দলও ধেয়ে আসছিল।

দোতং পাহাড় অতিক্রমের পর
আদিলের কথায় কান না দেয়ার মাসুল দিয়েছি আমরা পরে। ট্রেইলটা একটু পরেই দুইভাগ হয়ে গেল, আমাদের জিপিএস বলছে যে বামের ট্রেইল ধরা উচিত, কিন্তু যোশী ভাইয়া বললো যে ঐটা অন্য পাড়ার রাস্তা, আমাদের ডানে যাওয়া উচিত। অগ্যতা তর্ক না করে ডানের ট্রেইল ধরলাম। জিপিএস বলছে যে এই ট্রেইল আমাদের রেমাক্রি খালে নিয়ে যাবে। তারপর খাল ধরে অল্পকিছুদূর উজানে গেলেই বুলুং পাড়ার ট্রেইল পাব। এবার বাধা হল প্রকৃতি। বৃষ্টি শুরু হলো তুমুলভাবে, আমরা যখন খালে পৌছাই তখন সন্ধ্যাও হয়ে গেছে প্রায়। খালে প্রচুর স্রোত, তারমানে উজানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। যারা বান্দরবানে যান, তারা জানেন যে ঝিরি বা খালে নির্দিষ্ট একটি পাড় দিয়ে হাটা যায় না, বারবার খালের এপার ওপার করতে হয়। রেমাক্রীর স্রোত বেশি থাকায় ও অন্ধকার থাকায় আমরা এটি করতে পারছিলাম না। অগ্যতা এক পাড় ধরেই জংগল ঠেলে এগোচ্ছি এবং প্রথম দূর্ঘটনায় পড়লাম আমরা সবাই। তুহিনের পা স্লিপ করে বসলো, ডান হাতে মারাত্মক আঘাত পেল। এই অবস্থায় সে আর জংগল ঠেলতে পারবে না বা ফেলে আসা ট্রেইলে যে ব্যাক করবে সেটাও সম্ভব না। মানসিকভাবে সবাই এখানেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তুহিন দেখালো অসম সাহসিকতা। তুহিন বললো এখানে থাকলে সবার হাইপোথারমিয়া হবে, সে হাটবে। এই ছেলেটার সাহস আর টিম স্পিরিট দেখার মত। আসলে আমাদের এই দলটাই অনন্য, কারো কোন কমপ্লেইন নেই। এমনকি ভূতের ভয় পাওয়া আদিলও সেই রাতে অসম্ভব টিম স্পিরিট দেখিয়েছে। ঠিক করলাম প্রথম যেই পয়েন্টে যোশী ভাইয়ার কারণে ট্রেইল ভুল করেছিলাম সে পয়েন্টে ফেরত গিয়ে এবার বামের ট্রেইল ধরবো। সাবধানে হাটছি আমরা। তুহিনের ব্যাগ পালাক্রমে আমার আর মেহেদীর বুকে, পিঠে নিজের ব্যাগতো আছেই। সবাই হঠাৎ থেমে গেল, চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছে সাকা হাফং। আমি নিশ্চিত যে খুব কম মানুষ সাকা হাফং এর এই সৌন্দর্য দেখেছে। টিম মেম্বারদের নিয়ে খুব গর্ব হল। এত জঘন্য অবস্থায়ও সবাই পাহাড়ের রুপ উপভোগ করছে। মিনিট পনেরো পর আবার হাটা শুরু। অবশেষে রাত ১২ টার কিছুপর খুঁজে পেলাম বুলুং পাড়া। বুলুং দাদার ঘরের সামনে এসে ডাক দিলাম, ' কারবারি দাদা আছেন ?' ভিতর থেকে জবাব এল, ' এতক্ষণে এসে পৌছলে দাদা'।
পরদিন আর কোন হাটাহাটি হল না। কাল রাতের ধকল কাটানোর জন্য সারাদিন লেটানো হল। হরেক রকম সবজি আর রেমাক্রী খালের মাছ দিয়ে খাওয়া দাওয়া হল ভালো মতই।
পরদিন আর কোন হাটাহাটি হল না। কাল রাতের ধকল কাটানোর জন্য সারাদিন লেটানো হল। হরেক রকম সবজি আর রেমাক্রী খালের মাছ দিয়ে খাওয়া দাওয়া হল ভালো মতই।

বুলুং পাড়ায় অলস দুপুরে
এই পাড়ায় একটি মাচা আছে, একদম সাকা হাফং(Saka Haphong) বরাবর। এই মাচায় বসে একদিন কেনো, চাইলে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়া যাবে।
সকালে বের হয়ে পড়লাম আমরা। আজ নয়াচরণ পাড়া ছাড়িয়ে রেমাক্রী ক্রস করে ফেলার ইচ্ছে আছে। দুপুর নাগাদ নয়াচরণ পাড়ায় পৌছলাম। গাছখেকোরা ক্যাম্প করেছে এই পাড়ায়, একটু পর পর বিকট শব্দ করে ভূপাতিত হচ্ছিল এক একটি বৃক্ষ।দুপুরের পর বৃষ্টি শুরু হল, কারবারির বাসায় বসে জিড়িয়ে নিলাম কিছুক্ষণ। বিকেলের দিকে বের হয়ে গেলাম। খাল পেরিয়ে আজ হাঞ্জরাই পাড়ায় চলে যাওয়ার ইচ্ছে, কিন্তু রেমাক্রীতে নেমে চোখ চড়কগাছ। উজানে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় রেমাক্রী খালে ঢল নেমেছে। এই

রেমাক্রী খাল ও হাঞ্জরাই পাড়া
খাল এখন খরস্রোতা, পার হওয়া সম্ভব হবে না। ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পরেও পানি না কমায় নয়াচরণ পাড়ায় ফিরে গেলাম। আড্ডা গল্পে সময় যাচ্ছিল। তবে সত্যি কথা বলতে সবাই আমাদের নিরুৎসাহিত করছিল। রাতের খাওয়ার পর ছোট করে টিম মিটিং করলাম আমরা এবং সিদ্ধান্ত নিলাম কালই সাকা হাফং আরোহণ করা হবে।
ভোরের সূর্য তখনো তার উষ্ণতা ছড়ানো শুরু করে নি, আমরা আবার রেমাক্রীর পাড়ে এসে পৌছলাম। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পানি নেমে গিয়েছে, সাবধানে আমরা খাল পার হলাম। খালের অপর পাড়েই হাঞ্জরাই পাড়া। ছোট গ্রাম, মাত্র তিনটি ঘর এবং পাড়ায় কোন মানুষ বা কোন প্রাণী নেই। এই পাড়ার জুম দূরে হওয়াতে সবাই প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে সবাই জুমে চলে গেছে এমনকি গৃহপালিত পশুদেরও সাথে নিয়ে গেছে।পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে খালের পূর্ব পাড় ধরে আমরা এগিয়ে গেলাম নেফিউ ঝিড়ির খালে মেশার স্থান পর্যন্ত।ঝিড়ির পাশে দিয়ে নেফিউ পাড়ার রাস্তা। এই ট্রেইল আমাদের নেফিউ ফলস এর কাছে নিয়ে আসলো। সেখানে দেখা পেলাম আরো গাছখেকোদের। আফসোস লাগলো খুব। নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে সাধারন মানুষদের এই পাহাড়ে আসার অনুমতি মেলে না, অথচ এই গাছখেকোরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।নিরাপত্তা রক্ষীদের দায়িত্ব ও পাহাড়ে এদের অবস্থানের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ভোরের সূর্য তখনো তার উষ্ণতা ছড়ানো শুরু করে নি, আমরা আবার রেমাক্রীর পাড়ে এসে পৌছলাম। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পানি নেমে গিয়েছে, সাবধানে আমরা খাল পার হলাম। খালের অপর পাড়েই হাঞ্জরাই পাড়া। ছোট গ্রাম, মাত্র তিনটি ঘর এবং পাড়ায় কোন মানুষ বা কোন প্রাণী নেই। এই পাড়ার জুম দূরে হওয়াতে সবাই প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে সবাই জুমে চলে গেছে এমনকি গৃহপালিত পশুদেরও সাথে নিয়ে গেছে।পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে খালের পূর্ব পাড় ধরে আমরা এগিয়ে গেলাম নেফিউ ঝিড়ির খালে মেশার স্থান পর্যন্ত।ঝিড়ির পাশে দিয়ে নেফিউ পাড়ার রাস্তা। এই ট্রেইল আমাদের নেফিউ ফলস এর কাছে নিয়ে আসলো। সেখানে দেখা পেলাম আরো গাছখেকোদের। আফসোস লাগলো খুব। নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে সাধারন মানুষদের এই পাহাড়ে আসার অনুমতি মেলে না, অথচ এই গাছখেকোরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।নিরাপত্তা রক্ষীদের দায়িত্ব ও পাহাড়ে এদের অবস্থানের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

নেফিউ জঙ্গল
যাই হোক, নেফিউ ফলস এর পর আমরা পাড়ার ট্রেইল ছেড়ে ঝিড়ি ধরে উপরে উঠা শুরু করি। এই ঝিড়ি থেকে যখন আমরা সাকার ট্রেইলে উঠি তখনই তুহিন আবার আহত হয়। নেফিউ পাড়া আর বিজিবি ক্যাম্প আমরা পিছনে ফেলে এসেছি।যখনই ভাবলাম যে আর কোন বাঁধা নেই, তখনই এই বিপত্তি। ‘আমরা এখান থেকেই ব্যাক করবো কিনা’ এই টাইপ ভাবনা ভাবতে ভাবতেই তুহিন বললো আমাকে জঙ্গলে রেখে আপনারা এগিয়ে যান। আবারো ছেলেটি তার সাহসের পরিচয় দিল। তুহিনকে এক জায়গায় সরিয়ে, তার কাছে ব্যাগপ্যাক রেখে আমরা পা চালালাম চূড়ার(Saka Haphong) উদ্দেশ্যে। ট্রেইলের অবস্থা জঘন্য, কাঁদা আর জোঁকে একেবারে মাখামাখি। এভাবেই এসে নামলাম সাকা ঝিড়িতে। এরপর ট্রেইলের আর কোন বালাই নেই। জিপিএসে দেখে, চূড়ো বরাবর কোণাকুণি বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে খাড়া উঠতে থাকলাম শেষের ৫০০ ফিটের মত। অবশেষে আজ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, দুপুর বারোটার কিছু পর আমরা উঠে আসলাম সাকা হাফং(Saka Haphong) এর চূড়োয়, আমাদের দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে(Saka Haphong)। চার বছর আগে দেখা একটি ছোট স্বপ্ন পূরণ হলো আজ।

সাকা হাফং(Saka Haphong) এর চূড়ায় আমরা চার জন
কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে নামতে শুরু করলাম। তুহিনের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। মাথা থেকে সব চিন্তা দূর করে নামার দিকে মনোযোগ দিলাম। অনেক কুচিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল তুহিনকে নিয়ে। প্রায় তিন ঘন্টা হয়ে গেছে তাকে এই জঙ্গলে রেখে এসেছি। তুহিনকে আগের জায়গায় দেখে এত ভালো লাগলো যে মনে হল সামিটে পৌছেও এত আনন্দ পাইনি মনে হয়।
তারপর ?
তারপর শুরু হল থানচি অভিমুখে আমাদের ফিরতি যাত্রা। ঐ গল্প আর নাই বা বলি।
এখানে ক্লিক করুন। ভিডিওটি আমাদের সাকা হাফং ট্রিপের। কারো ইচ্ছে হলে দেখে নিতে পারেন।:D সাবস্ক্রাইব করে পাশেও থাকতে পারেন।